বাংলাদেশে অনেক তরুণ-তরুণী এখন একই দোটানায়: দেশে থেকে ক্যারিয়ার গড়বো, নাকি বিদেশে চলে যাবো? এই প্রশ্নটা শুধু আবেগের না—এটা বাস্তবতার। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির বাজারে চাপ, মূল্যস্ফীতি, নিয়োগের গতি কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে হয়। আবার অন্যদিকে, “বিদেশে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই ধারণাটাও অনেক সময় বাস্তবতার সাথে মেলে না; সেখানে খরচ, ভিসা, মানসিক চাপ, স্কিল-চাহিদা, কাজের নিয়ম—সবই নতুন চ্যালেঞ্জ।
এই ব্লগে আমরা ৩টা জিনিস করব—
-
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কী কী ঝুঁকি/সুযোগ আছে তা বুঝব
-
দেশে থাকা বনাম বিদেশে যাওয়ার একটি বাস্তব তুলনা করব
-
আপনার জন্য একটি সিদ্ধান্ত-চেকলিস্ট দেব—যেটা ফলো করলে “কোনটা আমার জন্য ঠিক” তা পরিষ্কার হবে
১) এখনকার প্রেক্ষাপট: অনিশ্চয়তা কেন বেড়েছে?
রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে—ইনভেস্টমেন্ট, নতুন নিয়োগ, ব্যবসার আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬-এ জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত—এবং এটি ২০২৪-এর বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার পর প্রথম নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ট্রানজিশন পিরিয়ডে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে অপেক্ষা-মানসিকতায় চলে যায় (নিয়োগ/বিনিয়োগে “দেখি কী হয়” ধরনের আচরণ)। Reuters+1
আর চাকরির বাজারের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো—ইয়ুথ আনএমপ্লয়মেন্ট এবং স্কিল মিসম্যাচ। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরির চাহিদা অনুযায়ী স্কিল নেই—ফলে একদিকে গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব বেশি, অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রি “যোগ্য লোক পাই না” বলে। এই সমস্যা নিয়ে ILO এবং IGC-এর গবেষণায়ও স্কিল-মিসম্যাচ, টিভেট/ডিমান্ড-ড্রিভেন ট্রেনিং, ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতার প্রয়োজন—এসব উঠে এসেছে। International Labour Organization+2International Growth Centre+2
তবে শুধু খারাপ খবরই না—রেমিট্যান্স প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ার তথ্যও দেখা যাচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতিতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে। The Daily Star+2BSS+2
এখন মূল কথা: এই পরিস্থিতিতে “ক্যারিয়ার” সিদ্ধান্তটা আপনি ঝুঁকি-পরিচালনা হিসেবে নিলে সবচেয়ে ভালো ফল পাবেন।
২) দেশে ক্যারিয়ার গড়া: কখন এটা সেরা সিদ্ধান্ত?
দেশে থাকা “ভুল” না—অনেক ক্ষেত্রে এটা সবচেয়ে স্মার্ট সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে যদি—
আপনি যেসব সুবিধা পান
-
ফ্যামিলি সাপোর্ট + কম খরচে থাকা: নতুন ক্যারিয়ারে শুরুর সময় নগদ চাপ কম থাকে
-
নেটওয়ার্কিং দ্রুত হয়: পরিচিত পরিবেশে ইন্টার্ন/এন্ট্রি লেভেল সুযোগ ধরা সহজ
-
লোকাল মার্কেট বোঝা যায়: সেলস, মার্কেটিং, ই-কমার্স, সার্ভিস/এজেন্সি—এগুলোতে লোকাল অ্যাডভান্টেজ
-
দ্রুত এক্সপেরিমেন্ট: ছোট পরিসরে কাজ/ফ্রিল্যান্সিং/স্টার্টআপ ট্রাই করা যায়
কিন্তু দেশে থাকার কিছু বাস্তব বাধা
-
নিয়োগ কমে গেলে কনসিস্টেন্ট জব পেতে সময় লাগতে পারে
-
সেলারি গ্রোথ সেক্টরভেদে সীমিত হতে পারে
-
কিছু ক্ষেত্রে মেরিটের বাইরে প্রভাব আপনার পথে বাধা হতে পারে
দেশে থেকে ক্যারিয়ার গড়ার “বেস্ট স্ট্র্যাটেজি”
দেশে থাকলে শুধু “চাকরি খুঁজব”—এটা না; বরং লক্ষ্য হবে স্কিল + প্রমাণ (Portfolio) + নেটওয়ার্ক।
-
৯০ দিনের স্কিল প্ল্যান: Excel/Power BI, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব/ডিজাইন, ডেটা, সেলস—একটা ট্র্যাক ধরুন
-
প্রমাণ তৈরি: ৩–৫টা বাস্তব প্রজেক্ট/কেস স্টাডি
-
নেটওয়ার্ক: LinkedIn/ইন্ডাস্ট্রি ইভেন্ট/রেফারেল
-
বিকল্প ইনকাম: ফ্রিল্যান্স/পার্টটাইম/কনট্রাক্ট (চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ক্যাশফ্লো চালু রাখতে)
৩) বিদেশে যাওয়া: কখন এটা যুক্তিযুক্ত?
বিদেশে যাওয়ার মোটামুটি ৩টা বৈধ ও বাস্তব রুট বেশি দেখা যায়:
-
Higher Study (স্কলারশিপ/ফান্ডিং সহ)
-
Skilled Migration / Work Visa (অভিজ্ঞতা + চাহিদাসম্পন্ন স্কিল)
-
Employer Sponsorship (কমন না, কিন্তু সম্ভব)
বিদেশে যাওয়ার ভালো দিক
-
কিছু দেশে স্ট্রাকচার্ড জব মার্কেট ও স্পষ্ট ক্যারিয়ার পাথ থাকে
-
নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা
-
আন্তর্জাতিক এক্সপোজার, দক্ষতার মান উন্নয়ন
বিদেশে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি/চ্যালেঞ্জ
-
বড় খরচ ও আর্থিক চাপ (টিউশন/লিভিং/ভিসা)
-
ভিসা নিয়ম বদলাতে পারে—পরিকল্পনা হঠাৎ নষ্ট হতে পারে
-
নতুন দেশে একাকীত্ব/মানসিক চাপ
-
“পার্টটাইম করেই সব খরচ উঠবে”—এটা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়
-
স্কিল/ইংরেজি/ডকুমেন্টেশন দুর্বল হলে রিজেকশনের ঝুঁকি
(দেশভেদে নিয়ম আলাদা—অনেকে UK/Canada/Australia নিয়ে আগ্রহী; এসব জায়গায় ডকুমেন্টেশন ও ফিনান্সিয়াল প্রুফ, যোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে অফিসিয়াল/বিশ্বস্ত সোর্স দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।) IGC – Impact Global Consultant+2TCL Global Blog+2
৪) সিদ্ধান্ত নেওয়ার “সিম্পল ফ্রেমওয়ার্ক” (Stay vs Go)
নিজেকে ৭টা প্রশ্ন করুন। ৫টার বেশি “হ্যাঁ” হলে যে দিকটা মেলে, সেটাই আপনার জন্য বেশি যৌক্তিক।
A) বিদেশে যাওয়ার দিকে ঝোঁক বেশি হবে যদি—
-
আপনার হাতে সাফ ফাইন্যান্স প্ল্যান আছে (পরিবার/স্কলারশিপ/সেভিংস)
-
আপনার টার্গেট স্কিল আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন (Tech/Data/Healthcare ইত্যাদি)
-
ইংরেজি/টেস্ট/ডকুমেন্টেশন আপনি সময়ে করতে পারবেন
-
আপনি ১২–১৮ মাস ধৈর্য ধরতে পারবেন
-
আপনি মানসিকভাবে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত
-
আপনার দেশে ক্যারিয়ার ট্র্যাক বারবার আটকে যাচ্ছে
-
আপনার “go” প্ল্যান আছে, শুধু আবেগ না
B) দেশে থাকা বেশি ভালো হবে যদি—
-
আপনি দেশের ভেতরে রিয়েল সুযোগ দেখছেন (ইন্টার্ন, রেফারেল, প্রজেক্ট)
-
আপনার খরচ/ঝুঁকি কমিয়ে স্কিল বিল্ড করা সম্ভব
-
আপনি ৬–৯ মাসের মধ্যে পোর্টফোলিও+চাকরি টার্গেট করতে পারবেন
-
পরিবারিক দায়িত্ব/ফাইন্যান্স আপনাকে এখনই বিদেশে যেতে বাধা দিচ্ছে
-
আপনি উদ্যোক্তা/ফ্রিল্যান্সিং/রিমোট কাজের দিকে এগোতে চান
৫) যেটাই বেছে নিন—“ক্যারিয়ার সেফ” করার ৬টা কাজ (Must-Do)
-
একটা স্কিল ট্র্যাক বাছুন (একসাথে ১০টা না)
-
CV + LinkedIn + Portfolio—৩টা একসাথে ঠিক করুন
-
ইন্টারভিউ প্র্যাকটিস (কমিউনিকেশন + স্টোরি টেলিং)
-
নেটওয়ার্কিং রুটিন: প্রতিদিন ১০ মিনিটও হলে চলবে
-
ফাইন্যান্স ডিসিপ্লিন: খরচ ট্র্যাক, ইমার্জেন্সি ফান্ড
-
Plan B রাখুন: চাকরি না হলে কী করবেন (ফ্রিল্যান্স/টিউটরিং/প্রজেক্ট)
উপসংহার: “দেশ না বিদেশ”—একটা নয়, বরং টাইমলাইন প্রশ্ন
আপনি চাইলে সবচেয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত হতে পারে:
-
এখন ৬ মাস দেশে থেকে স্কিল+পোর্টফোলিও বিল্ড
-
তারপর বিদেশের জন্য প্রস্তুতি শুরু (যদি দরকার হয়)
অথবা -
এখনই “go” নয়, আগে স্কলারশিপ/ফান্ডিং/স্কিল নিশ্চিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ট্রানজিশনের মধ্যে চাকরির বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণও আছে। LightCastle Partners+1
কিন্তু একই সাথে দক্ষতা-ভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়তে পারলে সুযোগও তৈরি হয়—কারণ স্কিল-মিসম্যাচ সমস্যা সমাধানে যারা এগোতে পারে, তারাই এগিয়ে যায়। International Growth Centre+1
লেখকঃ তৌহিদুর রহমান
Popular Searches: বাংলাদেশে ক্যারিয়ার গড়া, বিদেশে যাওয়া নাকি দেশে থাকা, ক্যারিয়ার গড়বো নাকি বিদেশে যাবো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও ক্যারিয়ার, দেশে চাকরি নাকি বিদেশে চাকরি, বাংলাদেশ ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত, বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত,ক্যারিয়ার পরিকল্পনা বাংলাদেশ



